সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল নিয়ে আলিফ গ্রুপের ফাঁদে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা

Date: 2023-07-12 17:00:09
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল নিয়ে আলিফ গ্রুপের ফাঁদে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা
২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর থেকে ‘জেড’ক্যাটাগরিতে থাকা সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল অধিগ্রহণ সংক্রান্ত পরিকল্পনার প্রস্তাব বিএসইসিতে জমা দিয়েছিল আলিফ গ্রুপ। সেই প্রস্তাবে ২০২১ সালের ০৭ অক্টোবর সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।এরপর আলিফ গ্রুপের তত্বাবধানে বন্ধ হওয়ার পাঁচ বছর পর ফের উৎপাদনে ফিরেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল। প্রাথমিকভাবে কোম্পানিটি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। কোম্পানিটির পরীক্ষামূলক উৎপাদন উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। চট্টগ্রামে অবস্থিত কোম্পানিটির কারখানা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে তিনি এটি উদ্বোধন করেন।কিন্তু উদ্ভোধন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক থাকলেও আলিফ গ্রুপ কোম্পানিটিকে চালু করে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। অর্থাৎ বিএসইসির চেয়ারম্যান উদ্ভোধন করার পর পরই কোম্পানিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত উৎপাদনের কোনো খবর নেই। কোম্পানিটির ফ্যাক্টরী পরিদর্শন করে এমন তথ্যই পেয়েছে শেয়ারনিউজের প্রতিবেদক।অথচ কোম্পানিটির মালিকানায় আসছে আলিফ গ্রুপ। এই খবরে দেড় টাকার শেয়ারদর বাড়তে শুরু করে। এরপর উৎপাদনে ফিরেছে এই খবরকে কেন্দ্র করে শেয়ার দরে আরও লাফ মারে। এখন আবার বোর্ড মিটিংয়ের খবর দিয়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর লেনদেন হচ্ছে ১২ টাকায়। অর্থাৎ ২০২০ সালের পর থেকে বন্ধ থাকা কোম্পানিটির শেয়ারদর দেড় টাকা থেকে বেড়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা বা ৭০০ শতাংশ।একের পর এক খবর দিয়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বৃদ্ধি করলেও আসল বিষয় এখনও উৎপাদনেই ফিরতে পারেনি কোম্পানিটি। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের মিথ্যা টুপি পড়িয়ে পথে বসানোর ব্যবস্থা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কারণ বিনিয়োগকারীরা জানে কোম্পানিটি উৎপাদনে ফিরেছে। আর এখন বোর্ড মিটিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে। বাজার গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে, উৎপাদনে থাকা কোম্পানিটির বোর্ড মিটিংয়ে আর্থিক প্রতিবেদন ভালো আসবে।আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে পারলে বিনিয়োগকারীরা হুমড়ি খেয়ে এই শেয়ারে বিনিয়োগ করবে। কারণ ভালো আর্থিক প্রতিবেদন থেকে ভালো ডিভিডেন্ডও ঘোষণা আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কোম্পানিটি উৎপাদনেই ফিরতে পারেনি। বিএসইসির চেয়ারম্যানের মাধ্যমে উৎপাদনে করে বিনিয়োগকারীদের সাথে বড় ধরণের প্রতারণা করেছে আলিফ গ্রুপ।http://www.sharenews24.com/editor_image/New Folder/alif_1.jpgনিরাপত্তারক্ষীরাঅলস সময় কাটাতে নিরাপত্তা কক্ষে লুডু খেলছেনকোম্পানিটি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর বিষয়টি নিয়ে শেয়ারনিউজের পক্ষ থেকে কথা বলা হয় বিএসইসির চেয়ারম্যানের সাথে। তিনি শেয়ারনিউজকে জানান, কোম্পানিটি পরিক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে পূর্ণ উৎপাদনে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল বিএসইসিকে। কিন্তু কোম্পানিটি এখনও উৎপাদনেই ফিরেনি, এমন তথ্য বিএসইসি জানে না।বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, একই স্থানে আলিফ গ্রুপের অন্য একটি ফ্যাক্টরী রয়েছে যেটা সিঅ্যন্ডএ টেক্সটাইলের পরেই উৎপাদনে ফেরানোর কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষ। কিন্তু এখনও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলকেই উৎপাদেন ফেরাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এতে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।বিএসইসির চেয়ারম্যান আরও বলেন, কোম্পানিটি উৎপাদনে না থাকলে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময় যে মেশিনারীজগুলো দেখিয়েছে, সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। এতে করে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-কে প্রতিষ্ঠানি পরিদর্শনে পাঠাবে বলে শেয়ারনিউজকে নিশ্চিত করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান।এ বিষয়ে আলিফ গ্রুপের এমডি আজিমুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের জন্য বার বার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে কোম্পানির সিএফও আনিসুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করে পরিচয় গোপন করেন। শেয়ারনিউজকে জানিয়েছেন তিনি আনিসুর রহমান না। অথচ আনিসুর রহমানের নাম্বার শেয়ারনিউজকে দিয়েছে আলিফ গ্রুপেরই আরেক কর্মকর্তা।বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বিএসইসির সিঅ্যান্ডেএ টেক্সটাইলের দায়িত্ব আলিফ গ্রুপকে দিলেও আলিফ গ্রুপ বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা করেছে। বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলার সকল নকসা বাস্তবায়ন করেছে। এতে করে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরও ভালোভাবে নজরে নিবেন বলে তারা একান্তভাবে আশা করেন।সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলেরপেছনের কথাবস্ত্র খাতের কোম্পানি সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ২০১৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ার ছেড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে।শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার তিন বছর পার না হতেই ২০১৭ সালে কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক তৈরি পোশাক ক্রেতাদের সংগঠন অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের চাহিদা অনুযায়ী কারখানা সংস্কারের কথা বলে ২০১৭ সালের ১ মে উৎপাদন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ।এরপর আর উৎপাদনে না ফেরায় অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিএসইসির দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্পানিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। তারই অংশ হিসেবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আলিফ গ্রুপের পক্ষ থেকে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আলিফ গ্রুপের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অক্টোবরে বিএসইসি কিছু শর্ত দিয়ে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল অধিগ্রহণে সম্মতি দেয়। কিন্তু এখন এই গ্রুপটিই কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা করছে বলে মনে করছে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা।আলিফ গ্রুপকে যেসব শর্ত দেওয়া হয়- নতুন শেয়ার ইস্যু ও বন্ডের মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধিতে আসন্ন নতুন ম্যানেজমেন্টকে প্রযোজ্য সব সিকিউরিটিজ আইন পরিপালন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধি-বিধান পরিপালন করে আলিফ গ্রুপকে তাদের প্রস্তাবিত অধিগ্রহণ কার্যক্রম নিষ্পত্তি করতে হবে। সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলকে উৎপাদনে ফেরাতে আলিফ গ্রুপ অবিলম্বে কাজ শুরু করবে। এ জন্য গ্যাস লাইনসহ অন্যান্য সব ইটিলিটিজের সমস্যা কাটিয়ে তুলবে। আলিফ গ্রুপকে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ব্যাংকের দায় মেটাতে হবে। আলিফ গ্রুপের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ ও আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিংকে সিকিউরিটিজ আইন মেনে ঝুলে থাকা সব এজিএম সম্পন্ন এবং আর্থিক প্রতিবেদনে দাখিল নিয়মিত করতে হবে। শেয়ার মানি ডিপোজিটের বা সংগৃহীত অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখতে হবে। যা দিয়ে শুধুমাত্র ব্যাংকের দায় মেটানো ও উৎপাদন চালুর কাজে ব্যবহার করা যাবে। সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের উৎপাদন শুরু করতে আলিফ গ্রুপ সকল ধরনের উদ্যোগ এবং দায় নেবে।

Share this news