পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে পাঁচ বছরের ‘থ্রি-আর’ সংস্কার পরিকল্পনা

Date: 2026-08-24 06:00:03
পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে পাঁচ বছরের ‘থ্রি-আর’ সংস্কার পরিকল্পনা
দীর্ঘদিনের মন্দা, অনিয়ম ও ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করতে পাঁচ বছরের একটি সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনায় পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ‘থ্রি-আর’ -পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন কৌশলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।সরকার অনুমোদিত ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক নীতিদলিলটি প্রণয়ন করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় পাঁচ বছরের এ পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।পরিকল্পনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।পরিকল্পনার প্রথম ধাপ ‘রিকভারি’ বা পুনরুদ্ধার পর্যায়ে পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাজার কারসাজি প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে।দ্বিতীয় ধাপ ‘রিস্টোরেশন’ বা পুনঃস্থাপন পর্যায়ে বন্ড ও সুকুকসহ নতুন নতুন আর্থিক পণ্য চালুর মাধ্যমে বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।সবশেষে ‘রিকনস্ট্রাকশন’ বা পুনর্গঠন পর্যায়ে ২০৩১ সালের মধ্যে পুঁজিবাজারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।নীতিদলিলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা বর্তমানে অতিরিক্তভাবে ব্যাংকনির্ভর। এর ফলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বাড়ছে এবং সম্পদ ও দায়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।অন্যদিকে পুঁজিবাজারে সুশাসনের ঘাটতি, বাজার কারসাজি, দুর্বল তথ্য প্রকাশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের স্বাধীনতা, কারিগরি সক্ষমতা ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়। বাজার কারসাজি দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগও থাকবে।তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা ও করপোরেট সুশাসনের মান উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর করতে নতুন আর্থিক পণ্য চালুর কথা বলা হয়েছে।এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব বন্ড, সামুদ্রিক অর্থনীতিভিত্তিক বন্ড, সামাজিক বন্ড এবং ইসলামিক সুকুক। এসব পণ্যের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।পুঁজিবাজারের অস্থিরতা কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড, ভবিষ্য তহবিল, বীমা তহবিল ও পেনশন তহবিলকে বাজারে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।একই সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ও উদীয়মান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থায় মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।পরিকল্পনার প্রথম বছরেই বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং কারসাজি ঠেকাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।পরিকল্পনা কমিশনের মতে, সংস্কার পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুল আলম। তবে পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের মূল সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।তার মতে, পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী নয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনতে নীতিগত বাধ্যবাধকতা বা কার্যকর প্রণোদনা প্রয়োজন।সাইফুল আলমের প্রস্তাব, কোনো প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করতে চাইলে এর অন্তত ২৫ টাকা পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহের সুযোগ বা বাধ্যবাধকতা রাখা যেতে পারে। এতে ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত হবে বলে মনে করেন তিনি।পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারিরও দাবি জানিয়েছেন ডিবিএ সভাপতি।তিনি বলেন, বাজার কারসাজির ঘটনায় সাধারণত ব্রোকারদের দায়ী করা হলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানির ভেতর থেকেও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে লভ্যাংশ ঘোষণার আগে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম তদারকিতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে, এতে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার ও বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে শুধু নতুন নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছরের ‘থ্রি-আর’ পরিকল্পনার সফলতাও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সংস্কারগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করা যায় এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কতটা দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার ওপর।

Share this news