পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবনে বড় উদ্যোগ, এক বছরে পরিবর্তনের আশ্বাস অর্থমন্ত্রীর

Date: 2026-10-05 06:00:02
পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবনে বড় উদ্যোগ, এক বছরে পরিবর্তনের আশ্বাস অর্থমন্ত্রীর
আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করতে সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে।রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও আন্তর্জাতিক সিকিউরিটিজ কমিশনসমূহের সংগঠন আইওএসসিওর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন।’বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক) তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন।অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে সরকার ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অটোমেশন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, অটোমেশন ও অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও পরবর্তী সময়ে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে এখন বাস্তবভিত্তিক উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো অংশীজনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। প্রচলিত অর্থায়নের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি অর্থব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অর্থায়নের কাঠামোও পরিবর্তন করতে চায় সরকার। উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।আমির খসরু বলেন, বিশ্বমানের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশকে ‘হাই স্ট্রিট থেকে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট’-এর দিকে যাত্রা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট, ডেরিভেটিভস, সিকিউরিটাইজেশন এবং ইক্যুইটি মার্কেটের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।আইএমএফ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংস্থাটির শর্তগুলো বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও বিভিন্ন পদক্ষেপে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা আস্থা প্রকাশ করেছেন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।তিনি বলেন, নিউইয়র্কে ডলার বন্ড এবং হংকংয়ে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সামুরাই বন্ড ও প্যান্ডা বন্ডের মতো বৈশ্বিক আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু গতানুগতিক বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এই অর্থায়ন সম্ভব নয়।তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। শুধু বিএসইসির একক প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।পুঁজিবাজারের সব অংশীজনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, হিসাবরক্ষক, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ।অতীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে মন্তব্য করে আমির খসরু বলেন, সবাই নিজ নিজ জায়গায় কাজ করলেও একে অন্যের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত ছিল না। সমন্বিত উদ্যোগের অভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হয়ে রয়েছে। ‘আমাদের কখনো সমন্বিত উদ্যোগ ছিল না’ উল্লেখ করে তিনি টেকসই পুঁজিবাজারের পরিবেশ গড়ে তুলতে সব অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ, পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার জন্য বাজারসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের স্বতঃস্ফূর্ত স্বনিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন চর্চা প্রয়োজন।তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারলে ভালো কোম্পানির কোনো অভাব নেই। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট না করে পুঁজিবাজারের সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। সংস্কার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোর বৃহত্তর পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

Share this news