দেশের চামড়া খাতে সুদিন কি আসবে

চট্টগ্রামের কালুরঘাট এলাকায় অবস্থিত টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রিফ লেদার লিমিটেড নামের ট্যানারিটি বছর চারেক আগেও ক্রয়াদেশ সংকটে ভুগছিল। চামড়ার দামও ভালো পাচ্ছিল না। ২০২০ সালের শুরুর দিকে চামড়া খাতের বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পায় প্রতিষ্ঠানটি। তারপর থেকেই তাদের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ায়।বর্তমানে রিফ লেদার মাসে ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ বর্গফুট চামড়া রপ্তানি করে। তাদের ৯-১০টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬টিই ইউরোপের। ভারতের দুটি জুতার কারখানায়ও তারা চামড়া সরবরাহ করে। এমনকি ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের জুতা উৎপাদন করে এমন বাংলাদেশি কারখানায়ও চামড়া সরবরাহ করছে এই পরিবেশবান্ধব ট্যানারি।রিফ লেদারের পরিচালক মো. মোকলেসুর রহমান গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব ট্যানারি গড়ে তোলার পর আমাদের বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের অপচয় কমেছে। অন্যদিকে চামড়ার দামও ভালো মিলছে। বর্তমানে ক্রয়াদেশের কোনো কমতি নেই আমাদের।’রিফ লেদার নিজেরা পারলেও সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি সরকার। ২০০ একর জমিতে একটি চামড়াশিল্প নগর করতে ২১ বছর পার করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ২০০৩ সালে নেওয়া হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে বর্তমানে সচল ট্যানারির সংখ্যা ১৪২। তবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। কঠিন বর্জ্য ফেলার জায়গা বা ডাম্পিং ইয়ার্ডের স্থায়ী ব্যবস্থাও হয়নি। পরিবেশদূষণের কারণে এই শিল্পনগরের কোনো ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদের জন্য আবেদন করতে পারছে না।চামড়া খাতের এই ব্যর্থতার কারণে কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না বাংলাদেশ। কারণ, বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে এলডব্লিউজি সনদ থাকতে হয়। বাংলাদেশে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের এই সনদ আছে। ফলে দেশের রপ্তানিকারকেরা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।ইউরোপসহ অনেক দেশে জুতাসহ বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া কারখানার চামড়া ব্যবহারের শর্ত রয়েছে। এ কারণে দেশের বেশ কয়েকটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বছরে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে।ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্যানুযায়ী, গত বছর চামড়া পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ছিল ৪৪১ বিলিয়ন বা ৪৪ হাজার ১০০ কোটি ডলারের। চলতি বছর সেটি বেড়ে ৪৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপের বাজারই ১৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের।চামড়া পণ্যের এত বিশাল বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা খুবই সামান্য। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২৪ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে।অন্যান্য দেশ এগিয়ে যাচ্ছে২০০৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস ও টিম্বারল্যান্ডের মতো কয়েকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিলে এলডব্লিউজি গঠন করে। পরিবেশ সুরক্ষায় জোর দিয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন নিশ্চিত করাই সংস্থাটির লক্ষ্য। বর্তমানে বিশ্বে এক হাজারের বেশি ব্র্যান্ড ও সরবরাহ খাতের প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজির সদস্য।এলডব্লিউজির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি কারখানা নিরীক্ষার জন্য একটি সাধারণ মান কাঠামো তৈরি করেছে। সে আলোকে নিরীক্ষা করে কারখানাগুলোকে গোল্ড, সিলভার, ব্রোঞ্জ ও সাধারণ কারখানা—এভাবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়। কারখানা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে তারা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্যান্য উপাদানের ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখে।সংস্থাটির ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭৩৩টি ট্যানারি এলডব্লিউজির সনদ পেয়েছে। এসব ট্যানারি বছরে ৫৩৯ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন করে। বর্তমানে এই সংস্থার সনদ পাওয়া সবচেয়ে বেশি ট্যানারি রয়েছে চীনে, যা সংখ্যায় ১৮৪। ভারতে এই সনদ পেয়েছে ১৭৭টি ট্যানারি। তাদের বেশ কয়েকটি নতুন ট্যানারি এই সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ ছাড়া ইতালিতে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া ট্যানারি আছে ১৩১টি।বাংলাদেশে মাত্র দুটি ট্যানারির এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে। এর মধ্যে দেশে প্রথম এলডব্লিউজি সনদ পায় অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ট্যানারি ইউনিট, ২০১৫ সালে। তারা নিরীক্ষায় সেরা মান, অর্থাৎ গোল্ড কারখানার মর্যাদা পেয়েছে। অ্যাপেক্স ওয়েট ব্লু নয়, চামড়া প্রক্রিয়াকরণের দ্বিতীয় ধাপ ‘ক্রাস্ট’ ও তৃতীয় ধাপ ‘ফিনিশড’ পর্যায়ে কাজ করে। আর ২০২০ সালের শুরুর দিকে ওয়েট ব্লু পর্যায়ে এলডব্লিউজি সনদ পায় চট্টগ্রামের রিফ লেদার। এ ছাড়া এবিসি ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানকে এলডব্লিউজি সনদ দেওয়ার বিষয়ে নিরীক্ষা চলছে।জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, চামড়াশিল্প নগরে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় ট্যানারির মালিকেরা এলডব্লিউজি সনদের জন্য আবেদন করতে পারছেন না। যদিও এখন প্রায় ২০টি ট্যানারি এই সনদ পাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ট্যানারিগুলো প্রক্রিয়াজাত প্রতি বর্গফুট চামড়া ৮৫-৯০ সেন্টে রপ্তানি করছে। অথচ এলডব্লিউজি সনদ থাকলে এর দ্বিগুণ দামে চামড়া ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা যেত।সাভারের চামড়াশিল্প নগরে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) বাইরে নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) তৈরি করতে দুটি ট্যানারিকে অনুমতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। ট্যানারি দুটি হচ্ছে অ্যাপেক্স ও বে। পরিকল্পনা ছিল, ইটিপি স্থাপন শেষে ট্যানারি দুটি এলডব্লিউজি সনদের জন্য আবেদন করবে। বে ট্যানারি ইটিপি স্থাপনের কাজ করলেও অ্যাপেক্স করছে না। কারণ জানতে চাইলে অ্যাপেক্সের এক কর্মকর্তা জানান, ইটিপি স্থাপনের পর পরিশোধন করা বর্তমান পাইপলাইনে ছাড়া যাবে না। এ জন্য নতুন লাইন করতে হবে। সেই লাইন আরেকটি কারখানার নিচ দিয়ে নির্মাণ করতে হবে। বিসিকের এমন বিধিনিষেধের মীমাংসা না হওয়ায় তাঁরা নির্মাণকাজে হাত দেননি।বিশেষজ্ঞ অভিমতজানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, চামড়াজাত পণ্যের বিশ্ববাজারে পরিবেশের মানদণ্ড পরিপালন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশের ব্যবসায়ীদের প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দেশের অভ্যন্তরীণ নাকি বিদেশের বাজারকেও তাঁরা প্রাধান্য দেবেন। রপ্তানি বাজারকে অগ্রাধিকার দিলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি তাঁদের বিনিয়োগে মনোযোগ দিতে হবে।খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চারটি ধাপে এগোতে পারে। প্রথমত, হেমায়েতপুরসহ অন্যান্য এলাকার ট্যানারিগুলোর মধ্যে যাদের সক্ষমতা আছে, তাদের ইটিপি স্থাপনসহ এলডব্লিউজি সনদের জন্য অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, হেমায়েতপুরের শিল্পনগরের সিইটিপিকে এলডব্লিউজি মানদণ্ডে উন্নীত করতে নতুন প্রকল্প নেওয়া। এ জন্য সংস্থাটির সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজটি করা যেতে পারে।অবশ্য এ ক্ষেত্রে মালিকদের মতামত আগে নিতে হবে। তৃতীয়ত, রপ্তানিমুখী বাজারের জন্য জামালপুরে প্রস্তাবিত চামড়াশিল্প নগরটি শুরু থেকেই এলডব্লিউজির তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। চতুর্থত, পরিবেশবান্ধব চামড়াশিল্প নগর গড়ে তুলতে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে অনীহাও একটি বাধা। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।