বীমা কোম্পানির দেওয়া তথ্যেই মিলছে না প্রকৃত চিত্র: আইডিআরএ চেয়ারম্যান
বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) যে তথ্য দেয়, তা সব সময় প্রকৃত ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটায় না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহারের কারণে তাদের প্রকৃত তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বসে ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন হাতে পেলেও সেটি দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি কার্যকরভাবে তদারকি করা কঠিন। তার ওপর সরবরাহ করা তথ্যই যদি সঠিক না হয়, তাহলে দেড় বছর আগের তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান ঝুঁকি চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব।শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত এক আবাসিক কর্মশালায় এসব কথা বলেন মীর নাদিয়া নিভিন। কর্মশালায় বীমা খাতের তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ে কথা বলেন তিনি।আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বীমা খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। একই সঙ্গে আইডিআরএর কাছে তথ্য সরবরাহের বিষয়টি আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় বিধান করা হবে।কোম্পানিগুলোর একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, জীবনবীমা ও সাধারণ বীমা—উভয় খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় সামনে এসেছে। ফলে কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যে তথ্য দিচ্ছে, তার সঙ্গে তাদের প্রকৃত ব্যবসার তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।এ কারণে যেসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক বা গোপন সার্ভার রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করে একীভূত করার জন্য ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।নির্দেশনা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের সার্ভার কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা আইডিআরের জন্য কঠিন নয়। প্রয়োজনে গ্যারেজ, বিছানার নিচে কিংবা দেশের অন্য যেকোনো জায়গা থেকেও এসব সার্ভার খুঁজে বের করা হবে।বীমা কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো বীমা খাতে এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোন কোম্পানি কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে আইডিআরএ প্রথম এ ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।বীমা খাতের তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে পুরো খাতের জন্য অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।তিনি বলেন, ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো বীমা খাতের জন্য একটি অভিন্ন পলিসি পরিচিতি নম্বর থাকবে। বর্তমানে প্রতিটি বীমা কোম্পানি নিজস্ব পলিসি নম্বর ব্যবহার করে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে ইউনিক পলিসি আইডি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।আইডিআরের বিভিন্ন দল বীমা কোম্পানিগুলোতে গিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু, প্রশিক্ষণ এবং ইউনিক পলিসি আইডি বাস্তবায়নের কাজ করছে বলেও জানান তিনি।তার মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো, ব্যবসার তথ্য আংশিকভাবে প্রকাশ করা কিংবা প্রকৃত ব্যবসার তথ্য গোপন করার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও জানান মীর নাদিয়া নিভিন।তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথ নিরীক্ষার পরিকল্পনাও রয়েছে।বর্তমানে কোনো কোম্পানির তথ্য যাচাই করতে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আলাদাভাবে চিঠি পাঠাতে হয় এবং জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এতে কোনো সংস্থার চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।নন-লাইফ বীমা খাতে ঋণপত্র বা এলসি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল নজরদারি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আইডিআরএ থেকে দেওয়া ইউনিক কভার নোট পরিচিতি নম্বর ছাড়া কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে পারবে না। এলসি খোলার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক আইডিআরের ব্যবস্থায় কভার নোটের তথ্য যাচাই করবে।এর ফলে প্রতিটি এলসির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বীমা ব্যবসার তথ্য আইডিআরের কাছে সংরক্ষিত থাকবে। এতে ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন করার সুযোগ কমবে।বকেয়া দাবি পরিশোধে সংকটে থাকা কয়েকটি বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য সম্পদ নগদায়নের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে বলে জানান নিভিন।তিনি বলেন, প্রথম ধাপে সাত থেকে আটটি কোম্পানিকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জমি, ট্রেজারি বন্ড, এফডিআরসহ বিভিন্ন সম্পদ নগদায়ন করে পাওয়া অর্থ আইডিআরের তদারকিতে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। সেখান থেকেই গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করা হবে।দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ যে গ্রাহকের দাবি আগে এসেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তার দাবি আগে পরিশোধ করা হবে।কোম্পানিগুলোর ব্যাংক হিসাব আইডিআরের তদারকিতে থাকবে এবং সেখানে নিরীক্ষকরাও উপস্থিত থাকবেন বলে জানান তিনি। ফলে কোম্পানিগুলোর সরাসরি ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। গ্রাহকদের দাবির তালিকাও নিরীক্ষকদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।বকেয়া দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিষয়টি তুলে ধরে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ বাকি রয়েছে। এ কারণে কোম্পানিটির নতুন প্রথমবর্ষের প্রিমিয়াম সংগ্রহ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নবায়ন প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।তিনি জানান, ফারইস্টের ফেনীতে থাকা একটি জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কিছু বন্ড নগদায়ন করে পাওয়া অর্থ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েক শ কোটি টাকা দিয়ে পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। আরও কয়েকটি সম্পত্তি বিক্রির জন্য দরপত্র দেওয়া হচ্ছে।ফারইস্টের সব সম্পদ ও বন্ড নগদায়ন করা হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। ওই অর্থ দিয়ে বড় একটি অংশের দাবি পরিশোধের পর কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।আইডিআরের জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ৭ হাজার কর্মী দিয়ে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানে আইডিআরএকে প্রায় ১৫০ জন জনবল দিয়ে ৮২টি বীমা কোম্পানি তদারকি করতে হচ্ছে।আইডিআরের আইনগত সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১০ সালের বীমা আইন বর্তমান আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে আইনটি হালনাগাদ ও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারের মতো কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক হিসেবে আইডিআরের নির্দেশনা কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই মানতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা না মানলে তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে দেওয়া হবে।সামনে আইডিআরএকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করাই তার মূল দায়িত্ব। বীমা খাতকে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাতে পরিণত করতে হলে প্রথমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।গণমাধ্যমের উদ্দেশে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বীমা খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুধু আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলেই হবে না, প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য প্রকৃত কি না, সেই প্রশ্নও করতে হবে।জনগণের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তুলে ধরলে বীমা খাতের সংস্কার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি গোলাম মাওলা। বিশেষ অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাজিম উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইআরএফের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।