আইপিওর খরা কাটছে, বাজারে আসছে দেশি-বিদেশি কোম্পানি: বিএসইসি চেয়ারম্যান

Date: 2026-10-05 06:00:03
আইপিওর খরা কাটছে, বাজারে আসছে দেশি-বিদেশি কোম্পানি: বিএসইসি চেয়ারম্যান
পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) খরা কাটতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বেশ কিছু কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দুই থেকে তিনটি বিদেশি কোম্পানির বাজারে আসার ঘোষণা আসতে পারে।রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা। এতদিন একটি আইপিও অনুমোদন পেতে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগত। বর্তমান কমিশন এ প্রক্রিয়া সহজ করেছে। এখন তিন মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে।তিনি বলেন, সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ আরও বাছাই করা কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে তালিকাভুক্তির কাজে আরও ক্ষমতাবান করা এবং নজরদারি ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।মাসুদ খান বলেন, অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনের পরিমাণ অনেক কম। অথচ বাজারমূলধনের অনুপাতে লেনদেনের হার পাকিস্তানের কাছাকাছি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দৈনিক প্রায় ৭০০ কোটি টাকা লেনদেনের বিপরীতে পাকিস্তানের বাজারে লেনদেন হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এর অন্যতম কারণ দেশটির বাজারমূলধন বেশি। তিনি বলেন, নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারমূলধন বাড়ানো গেলে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেন কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আইপিওর পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়মেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় কারা তালিকাভুক্ত হতে পারবে, সে বিষয়ে যোগ্যতার শর্ত কঠোর করা হয়েছে। ফলে শুধু প্রতিষ্ঠিত ও অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কোম্পানিগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে।বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে এ ব্যবস্থায় দ্রুততা ও আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানির মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, যাতে মূল্য নির্ধারণ আরও ন্যায্য হয়।একই সঙ্গে সরাসরি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি হাইব্রিড পদ্ধতিও চালু করা হয়েছে। এতে কোম্পানি একদিকে জনগণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে, অন্যদিকে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন।মাসুদ খান বলেন, বিএসইসির নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া। তাঁর দাবি, ফ্লোর প্রাইস চালুর পর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের আকর্ষণ কমে গিয়েছিল।এখন বাজারে লেনদেনের গতি বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে লেনদেন ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ওই সময়ে বিদেশিদের শেয়ার কেনার পরিমাণ বিক্রির চেয়ে বেশি ছিল। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার বাংলাদেশের বাজারে ফিরছেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অতীতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম আর হতে দেওয়া যাবে না। এ জন্য শেয়ারবাজারকে দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিতে হবে।এ ক্ষেত্রে ব্রোকারদের ব্যবহৃত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার একীভূত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। একটি অভিন্ন ও তাৎক্ষণিকভাবে সংযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ জানতে পারবে কোনো ব্রোকারের ব্যাংক হিসাবে কত টাকা রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে। একই সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসির নজরদারি ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।শুধু সফটওয়্যার নয়, অর্ডার ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আনার কথা বলেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, প্রতিটি অর্ডার ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় অ্যাপ থাকতে হবে এবং ওই অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ দিতে হবে। ভবিষ্যতে কাগজে শারীরিক স্বাক্ষরের প্রয়োজন থাকবে না। সব ধরনের নিশ্চিতকরণ স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।বিএসইসি চেয়ারম্যানের ভাষায়, অতীতে শেয়ারবাজারে যেসব প্রতারণা হয়েছে, তার বড় একটি কারণ ছিল কাগজভিত্তিক ও শারীরিক স্বাক্ষরনির্ভর ব্যবস্থা। তাই ডিজিটাল ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থায় যাওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণার সুযোগ কমাতে হবে।বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগের কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যমান সিকিউরিটিজ আইন ও সিকিউরিটিজ অর্ডিন্যান্স সমন্বয় করে একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে শেয়ারবাজার ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার সুযোগ তৈরি হবে এবং মামলার নিষ্পত্তিও দ্রুত হবে বলে আশা করছেন তিনি।বন্ড বাজারকে সক্রিয় করার ওপরও গুরুত্ব দেন মাসুদ খান। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।কারণ, বন্ডের বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন হলে শেয়ারবাজারের মাধ্যমেই বিনিয়োগ থেকে বের হওয়ার সুযোগ থাকতে হবে বলে জানান তিনি।নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ১৮০ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। পাশাপাশি গ্রিন বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ড বাজারে আসছে। বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো করপোরেট বন্ডে বড় বিনিয়োগ করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এতে দীর্ঘমেয়াদি স্থির আয়ের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে এবং বন্ড বাজার আরও গভীর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।দেশের প্রভিডেন্ট ফান্ডগুলোর বিনিয়োগেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগের কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। বর্তমানে এসব তহবিলের বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। ভবিষ্যতে এর একটি অংশ করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির কথা বলেন তিনি।মাসুদ খান বলেন, ডেরিভেটিভস চালুর প্রস্তুতিও চলছে। এ জন্য ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংস্কার আটকে ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন করে লভ্যাংশ, ঋণগ্রহণ ও রাইট শেয়ার ইস্যুসহ বিভিন্ন বিধিমালা পরিবর্তনের কাজও চলছে।শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে বেক্সিমকো প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, বেক্সিমকো বোর্ড পুনর্গঠনের পর লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির জিডিআর তালিকাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল। কমিশন জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে তা পুনরুদ্ধার করেছে এবং পরে আবার বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে।সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক করাই কমিশনের মূল লক্ষ্য বলে জানান মাসুদ খান। তাঁর মতে, আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত করা থেকে শুরু করে ডিজিটাল নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বন্ড বাজার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ সব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো বাজারের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে অনিয়মের সুযোগ কমানো।

Share this news